Home Uncategorized ফারাক্কা দিল্লির কূটনৈতিক অস্ত্র নাকি ঢাকার সার্বভৌমত্বের লড়াই

ফারাক্কা দিল্লির কূটনৈতিক অস্ত্র নাকি ঢাকার সার্বভৌমত্বের লড়াই

by Londonview24
0 comment

চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ। শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকার ক্ষমতার সমীকরণ বদলেছে; আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যও নতুনভাবে সাজছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই পানি, বাণিজ্য, ট্রানজিট ও নিরাপত্তার মতো বহুমাত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে। ফারাক্কা প্রশ্ন এখন কেবল নদীর নয়; এটি সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক শক্তির রাজনীতি এবং কৌশলগত ভবিষ্যতের এক জটিল পরীক্ষা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি চুক্তিকে লিভারেজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অপরদিকে, বাংলাদেশকে জাতীয় স্বার্থ ও ট্রানজিট–বিদ্যুৎ–বাণিজ্যকে একত্রিত করে দরকষাকষি করতে হবে। এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও আঞ্চলিক হাইড্রো-পলিটিক্স চুক্তির নবায়নকে আরো জটিল করে তুলেছে। সব মিলিয়ে এ বছর গঙ্গা ইস্যু শুধুই পানি নয়, বরং কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।

সম্প্রতি ভারতের লোকসভায় দেশটির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির পুনঃনবায়ন নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। তিনি একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পরই এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হবে।

তার এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যই দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে বড় রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে মেয়াদোত্তীর্ণ হতে যাওয়া ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি এখন শুধু একটি পানিসম্পদ চুক্তি নয়, বরং তা হয়ে উঠতে পারে আঞ্চলিক শক্তি-রাজনীতির একটি কার্যকর হাতিয়ার।

এ বিষয়ে টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক সুবাইল বিন আলম আমার দেশকে বলেন, ‘উজানের দেশ হিসেবে ভারত ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে গঙ্গার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে পানি চুক্তিকে রাজনৈতিক লিভারেজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ১৯৯৬ সালের ৩০ বছরের গঙ্গা চুক্তি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে; ভারত সরাসরি নবায়নের বদলে পুনঃআলোচনা চায়, আর বাংলাদেশের নতুন সরকার জাতীয় স্বার্থে পুনঃনবায়নের কথা বলছে। তবে প্রকাশ্য চাপ উভয় দেশের ট্রানজিট, বিদ্যুৎ (বাংলাদেশ এক হাজার ১৬০ মেগাওয়াটের বেশি আমদানি করে) ও কানেক্টিভিটির স্বার্থে ক্ষতি করতে পারে।’

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে দ্বিপাক্ষিক পথেই সমাধান চেয়েছে, তবে জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের জলপথ কনভেনশনে যোগ দেওয়ার ঘোষণা আন্তর্জাতিকীকরণের ইঙ্গিত। কৌশলগতভাবে পানি-বাণিজ্য-ট্রানজিটকে একসঙ্গে রেখে ‘ইস্যু লিংকেজ’ দরকষাকষি সম্ভব। ২০২৬-এর ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন চুক্তি না হলে সার্বভৌমত্ব বনাম আঞ্চলিক অর্থনীতির প্রশ্নে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হতে পারে; পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অবস্থানও জটিলতা বাড়াতে পারে।”

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচ. ডি. দেবগৌড়া ও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। দীর্ঘ টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে এটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট সূত্রে দুই দেশ পানি ভাগ করে নেয়। ৭০ হাজার কিউসেকের নিচে প্রবাহ হলে সমান ভাগ, ৭০-৭৫ হাজারের মধ্যে হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক, আর ৭৫ হাজারের বেশি হলে ভারত রাখবে ৪০ হাজার কিউসেকÑএমন তিন স্তরীয় কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। মার্চ ১১ থেকে মে ১০ পর্যন্ত বিকল্প ১০ দিনের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেক গ্যারান্টির বিশেষ ধারা যুক্ত ছিল।

কিন্তু ৩০ বছর পর এসে এই চুক্তির নবায়নের প্রশ্ন এমন এক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক কেবল নদীর স্রোত নয়, বরং ক্ষমতার স্রোতেও নির্ধারিত হচ্ছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম যা বলছে

সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইনডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ভারত সরকার বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল না দেখা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক আলোচনায় যেতে চায় না। একইভাবে দ্য ইনডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর চুক্তির শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নতুন কাঠামো দাঁড় করানো হতে পারে।

পত্রিকা দুটির এমন ভাষ্য কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং তা স্পষ্ট রাজনৈতিক ক্যালকুলেশন। বাংলাদেশে ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ভূমিধস বিজয় অর্জন করে ক্ষমতায় এসেছে। এমন অবস্থায় দিল্লি তার মিত্র শেখ হাসিনার পলায়নের পর এমন একটি সরকারকে সামনে রেখে আলোচনা করতে চায়, যাকে তারা কৌশলগতভাবে ‘বন্ধু’ মনে করে।

ফারাক্কা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক

গঙ্গা পানি বণ্টন বিতর্কের শিকড় অনেক পুরোনো। ১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হুগলি নদীর নাব্য রক্ষা ও কলকাতা বন্দর সচল রাখা। কিন্তু বাংলাদেশ অভিযোগ করে, এই পানি প্রত্যাহারের ফলে পদ্মা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, লবণাক্ততা বাড়ছে এবং কৃষি-জীবন হুমকির মুখে পড়ছে।

১৯৭৭ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পাঁচ বছরের একটি চুক্তি করেন। পরে ১৯৮২ ও ১৯৮৫ সালে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল কাঠামো আসে ১৯৯৬ সালে।

২০২৫ সালের মার্চে ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশন ও বাংলাদেশের যৌথ কারিগরি দল ফারাক্কা ব্যারাজ পরিদর্শন করে। প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত যৌথভাবে পানিপ্রবাহ পরিমাপ করা হয়। কিন্তু, বাস্তবে নির্ধারিত প্রবাহ সবসময় পাওয়া যায় না; বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে।

ভারতীয় পক্ষের যুক্তি হলো কলকাতা বন্দর, ফারাক্কা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অভ্যন্তরীণ সেচ ব্যবস্থার জন্যও পানি প্রয়োজন। সাম্প্রতিক আলোচনায় এমন ইঙ্গিতও এসেছে যে, নতুন চুক্তি আগের মতো ৩০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি না-ও হতে পারে; ১০-১৫ বছরের কাঠামো বিবেচনায় রয়েছে। মার্চ ১১ থেকে মে ১০ সময়কালে অতিরিক্ত ৩০-৩৫ হাজার কিউসেক পানি চাওয়ার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ আছে।

২০২৫ সালে পাহালগাম হামলার পর ভারত একতরফাভাবে ১৯৬০ সালের ইন্দুস ওয়াটারস ট্রিটি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ায় ‘পানি কূটনীতি’র নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। বাংলাদেশে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, গঙ্গা চুক্তিও এখন বৃহত্তর কৌশলগত কাঠামোর অংশ হয়ে উঠতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতে অভিযোগ করেছিলেন, রাজ্যের মতামত না নিয়েই কেন্দ্র চুক্তি নবায়নের পথে এগোচ্ছে। ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি তার আপত্তির কারণেই স্থগিত হয়েছিল। ফলে গঙ্গা চুক্তি নবায়নেও রাজ্য রাজনীতির প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। কেন্দ্র ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মতামত নিয়ে খসড়া তৈরি করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মাছ উৎপাদন হ্রাস ও নৌচলাচলে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বছরে প্রায় ২০ লাখ টন পলি সঞ্চিত হচ্ছে নিম্ন বদ্বীপে। একই সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকেও বলা হয়, পর্যাপ্ত পানি না থাকলে হুগলি নদীর নাব্য সংকট দেখা দেয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়।

গঙ্গা চুক্তি নবায়ন তাই নিছক একটি পানিসম্পদ বিষয় নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতির সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রতীক। ভারতের জন্য এটি হতে পারে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি লিভার; বাংলাদেশের জন্য এটি সার্বভৌম পানি-অধিকার ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত, চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে দুই দেশ পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে সহযোগিতা বাড়াবে, নাকি পানিকে কৌশলগত হাতিয়ারে রূপ দেবে।

You may also like

Leave a Comment