পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে বাজারে। বিশেষ করে রমজানে যেসব পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে; সেসব পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। গত কয়েকদিন সারা দেশে পণ্য-পরিবহন অনেকটা বন্ধ থাকায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এছাড়া বাজার তদারকিতে সরকারের মনিটরিং না থাকায় কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে বলে মনে করছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)।
সংগঠনটির সিনিয়র সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা নতুন সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। চলতি বছর নির্বাচনের কারণে সরকারি নজরদারির অভাবেও অসাধু ব্যবসায়ীরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। রমজান মাস মুসলমানদের জন্য নাজাতের মাস হলেও ব্যবসায়ীদের জন্য যেন এটি মুনাফার মাস। আমাদের দেশে রমজান এলেই সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে।
তবে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধিকেই দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। বাদামতলীর আড়তদার আলমাছ বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে বাড়ায় খেজুরের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরে যে অস্থিরতার কারণেও দাম বেড়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে রাজধানীর নয়াবাজার, হাতিরপুল ও কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খেজুরের দাম। গত বছর জাহিদি খেজুর প্রতি কেজি ১৮০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেড়েছে কাঁচামরিচের দামও। গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে প্রায় ৪০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কলার দাম বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। ২০ টাকার কলা এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা হালি। শসা ও লেবুর দামও চড়া; শসা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। আর লেবুর হালি মান ও আকার ভেদে ৫০ থেকে ১৫০ টাকায়।
ফলের দামও কিছুটা চড়া লক্ষ করা গেছে। আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, আনার প্রায় সব ধরনের আমদানি করা ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। দেশি ফলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ব্যবসায়ীরা চাহিদা বাড়ার কথা বললেও ভোক্তারা বলছেন, রমজানকে সামনে রেখে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাজার তদারকির ঘাটতি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট ঘিরে অনিশ্চয়তাও মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গতকাল রাজধানীর বাবুবাজার, নয়াবাজার, গুলিস্তান ও কারওয়ানবাজার বাজারে আপেল ২৬০-৩৫০ টাকা, ফুজি আপেল ৩০০-৩৫০ টাকা এবং সবুজ আপেল ৪০০-৪৫০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। কমলার দাম ৩০০-৩৮০ টাকা, মাল্টা ২৫০-৩০০ টাকা ও নাশপাতি ৩০০-৩৫০ টাকা। সাদা আঙুর ৫২০-৫৫০ টাকা, কালো আঙুর ৫৫০-৬০০ টাকা এবং আনার ৪৫০-৬৫০ টাকা। ড্রাগন ফল ২০০-২৫০ টাকা, সফেদা ১৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
তবে গত বছরের তুলনায় ছোলা, চিনি, লুজ সয়াবিন তেলের দাম কিছুটা কমেছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। মায়ের দোয়া স্টোরের ইমাম উদ্দিন বাবলু আমার দেশকে বলেন, হাতেগোনা কয়েকটি পণ্যের দাম হঠাৎ বাড়লেও গত রমজানের তুলনায় অধিকাংশ পণ্যের দাম কমেছে।
চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ফ্রেশ খেজুর আমদানি হয়েছে ৩৭ হাজার ৯৩১ টন। গত অর্থবছরে একই সময়ে হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ টন। এবার ১৫ হাজার ৯৪৫ টন বেশি আমদানি হলেও দাম কিছুটা চড়া।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৯০-৯৫ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে রোজার সময় বিক্রি হয় চাহিদার ৭০ শতাংশ খেজুর। বর্তমানে বাজারে কম দামে বিক্রি হচ্ছে জাহিদি খেজুর; কেজি ২৮০ টাকা। যার দাম সপ্তাহখানেক আগে ছিল ২৫০ টাকার আশপাশে। অন্যান্য ধরনের মধ্যে বরই খেজুর ৪৮০-৫০০ টাকা, দাবাস ৫০০, কালমি ৬০০-৭০০; মাবরুম ৮৫০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা, মরিয়ম এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা, মেডজুল এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রমজানকে সামনে রেখে সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিলে খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ের বিভিন্ন বাজার সমিতির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আব্দুর রহিম খান বলেন, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে দেশে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এবারের রমজানে এসব পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ নেই। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজি রোধ করতে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তারা। পাশাপাশি, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কিনে বাজারে বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করতে ভোক্তাদের প্রতি অনুরোধ জানান।
